২২শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৮ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ৩রা শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

কালীগঞ্জ আড়াইশ বছরের পুরনো মাছের (জামাাই) মেলাকে নিয়ে আনন্দ-উৎসব

বাংলা বারুদ
প্রকাশিত জানুয়ারি ১৯, ২০২৬, ০৮:৩৭ পূর্বাহ্ণ
কালীগঞ্জ আড়াইশ বছরের পুরনো মাছের (জামাাই) মেলাকে নিয়ে আনন্দ-উৎসব

Manual5 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি।

গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার জামালপুর ইউনিয়ন বিনিরাইলের শেষ প্রান্তে কাপাইশের বিলের মধ্যে জানুয়ারীর ১৪ তারিখে প্রায় আড়ইশো বছরের পুরাতন কৃষ্টি সংস্কৃতি ঐতিহ্য ধরে রাখতে এলাকার জনগণ এবং কালীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে
ঐতিহ্যবাহী এই মেলায় বিপুল লোক সমাগম হয় এই ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলায়।

Manual5 Ad Code

মূলত এটি ‘পৌষ মেলা’, কেউ বলে ‘জামাই মেলা’, আবার কেউ বলে ‘মাছের মেলা’। গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের বিনিরাইল (কাপাইস) গ্রামের এই মেলাকে ঘিরেই সেখানে দিনব্যাপী চলে আনন্দ-উৎসব।

Manual8 Ad Code

দিনটির জন্য সারাটি বছর অপেক্ষায় থাকেন উপজেলাবাসী সহ আশেপাশের জেলার এবং বিভিন্ন উপজেলার মানুষেরা। আড়াইশ বছরের বেশি সময় ধরে কালীগঞ্জের বিনিরাইল (কাপাইস) গ্রামে পৌষ মাসের শেষ দিনে বসে ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা।

আজ বুধবার সকালে সরেজমিন দেখা যায়, উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের বিনিরাইল (কাপাইস) গ্রামে ঐতিহ্যবাহী এই মেলায় বিপুল মানুষের সমাগম।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও গাজীপুর, টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ভৈরব, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ থেকে অনেক মানুষ এই মেলায় এসেছেন। প্রতি বছর পৌষ-সংক্রান্তিতে একদিনের জন্য এ মেলা জমে ওঠে।

তিন শতাধিক মাছ ব্যবসায়ী বাহারি মাছের পসরা সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। মাছের মেলায় রুই,কাতল,চিতল, বাগাড়, আইড়, বোয়াল, কালবাউশ, পাবদা, গুলসা, গলদা চিংড়ি, বাইম, ইলিশ, কাইক্কা, রূপচাঁদা মাছের পাশাপাশি স্থান পেয়েছে পাখিমাছসহ নানা রকমের সামুদ্রিক মাছও। পাশাপাশি মিষ্টি, বিভিন্ন ফল, খেলনা, বিভিন্ন প্রকারের আচারসহ সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি বালিশ মিষ্টি ৪০০ টাকা কেজি বিক্রি হয়। একটি বালিশ মিষ্টির ওজন সর্বোচ্চ তিন কেজি এবং সর্বনিম্ন এক কেজি।

মেলা আয়োজন কমিটির সভাপতি জাতীয়বাদী ওলামা দলের আহবায়ক মো আলী হোসেন আমাদের প্রতিনিধ কে জানান, পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে আড়াইশ বছরের বেশি সময় ধরে মেলাটির প্রচলন হয়।

মূলত ‘পৌষ মেলা’ হিসেবে শুরু হলেও পরে এটি ‘জামাই এবং মাছ মেলা’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। মেলাকে কেন্দ্র করে জামালপুর ইউনিয়নসহ আশপাশের কয়েক গ্রামের শ্বশুররা তাদের জামাইকে বাড়িতে নিমন্ত্রণ জানান।

এ মাছের মেলাকে ঘিরে আশেপাশের কয়েক জেলার মানুষের সমাগমে এখানে দিনভর চলে আনন্দ-উৎসব। মাছের মেলা হলেও চলে এলাকার জামাইদের বড় মাছ কেনার প্রতিযোগিতা। জামালপুর ইউনিয়নের বিনিরাইল, বক্তারপুর ও জাঙ্গালীয়াসহ আশপাশের গ্রামে যারা বিয়ে করেছেন, সেই জামাইরা হচ্ছেন মেলার মূল ক্রেতা ও দর্শনার্থী।

মেয়েরা তাদের স্বামীদের নিয়ে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসেন। তাই এ মেলা জামাই মেলা নামে পরিচিতি পায়।মেলায় পাওয়া বিভিন্ন ধরনের মিষ্টিমেলাটিকে ঘিরে ভিড় জমান দূর-দূরান্ত থেকে মাছ কিনতে আসা জামাই, এলাকার শ্বশুর ও উৎসুক দর্শনার্থীরা।

এবার মেলার প্রধান আকর্ষণ প্রায় লক্ষাধিক টাকা মূল্যের ৯ ফুট লম্বা ৯২ কেজি ওজনের পাখি মাছ। একদিনের মাছের মেলায় লাখো মানুষের ঢল। বুধবার (১৪ জানুয়ারী) সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলবে মেলা।

আয়োজক কমিটির সভাপতি মোঃ আলী হোসেন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেন,এবং জানিয়েছেন সকাল থেকে বিকাল ৫:৩০ মিনিট পর্যন্ত কোন অপ্রতিকর ঘঠনা ঘটে নাই, আশাকরি মেলা শেষ পর্যন্ত কোন রকম অপ্রতিকর ঘটনা ঘটবে না,বলে আমি আশাবাদী।

গাজীপুর চৌরাস্তার মা মৎস্য আড়তের মালিক শেখ সোহাগ ইসলামের মাছের স্টলে দেখা যায়, ক্রেতাদের জটলা লেগে আছে। বিক্রি আশানুরূপ ভালো হয়েছে।

রাজধানীর উত্তরখান থেকে এসেছেন সুব্রত কুমার। তিনি বলেন, ‘পৌষ মাসের শেষ দিনে বসেছে ঐতিহ্যবাহী বিনিরাইলের মাছের মেলা। দূর-দূরান্ত থেকে মেলায় ছুটে আসে হাজার হাজার মানুষ। কর্মব্যস্ততার কারণে খুব একটা সময় পাই না। আমি তিন বছর ধরে এ মেলায় হৃদয়ের টানেই ছুটে আসি।’

কালিয়াকৈরের সূত্রাপর থেকে শ্বশুরবাড়িতে এসেছেন জামাই সোয়ায়েব হোসেন। তিনি বলেন, ‘অনেক বছরের পুরনো এ মেলাটি আমার দেখার খুব শখ ছিল। তাই শ্বশুরবাড়ি থেকে নিমন্ত্রণ পেয়ে আমি মেলায় এসেছি। মেলা থেকে কিছু মাছ শ্বশুরবাড়ির জন্য কিনে নিয়ে যাবো।

মেলায় সামুুদ্রিক মাছও পাওয়া যায়স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি আব্দুল জব্বার জানান, কৃষকের ধান কাটার পর ওই জমিতে স্থানীয়রা এ মেলার আয়োজন করেন। মেলার প্রধান আকর্ষণ বিশাল আকৃতির মাছ। মেলাকে সামনে রেখে আশপাশের প্রতিটি বাড়িতে মেয়ে, জামাই, নাতি-নাতনি ও আত্মীয়-স্বজনে ভরে যায়।

Manual6 Ad Code

ঈদ, পূজা-পার্বণ বা অন্য কোনও উৎসবে দাওয়াত পেয়ে অনেক সময় শ্বশুরবাড়ি না আসলেও বিনিরাইলের মাছের মেলায় জামাইরা ঠিকই আসেন। বলতে গেলে এটি এক প্রকার রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। নদী ও সাগরের বড় বড় মাছ, মিষ্টি, তৈজসপত্রসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও বিক্রি হয় এ মেলায়। নানা রকমের খাবারের দোকানও বসেছে এ মেলায়।

মেলা আয়োজক কমিটির সভাপতি মাওলানা আলী হোসেন বলেন, ‘পৌষ মেলাটি এখন “জামাই এবং মাছের মেলা”য় পরিচিতি পেয়েছে। এ মেলা এখন আমাদের ঐতিহ্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সার্বজনীন উৎসবে রূপ নেওয়া মেলাটি এখন এই এলাকার মানুষের হৃদয়ের খোরাক।

Manual7 Ad Code

তবে একদিনের জন্য মেলা চললেও স্থানীয় জমির মালিকরা এ নিয়ে ক্ষুব্ধ। মেলা কৃষিজমিতে বসার কারণে লোকজনের চলাচলে তাদের জমি ও ফসলের অনেক ক্ষতি হয়ে যায়।’

কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এটি এম কামরুল ইসলাম আমাদের প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন ‘পুরনো এই মেলাকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে রয়েছে নানা ধরনের কথা।

তবে ইতিহাস-ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি গ্রাম-গঞ্জে এ ধরনের আয়োজনে আমাদের চিরায়ত বাংলার রূপই ফুটে ওঠে। বিনিরাইলের মাছের মেলাটি স্থানীয় একটি ঐতিহ্য।কালীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন এই মেলাকে স্বার্থক করতে চৌকস পুলিশের একটি টিম মেলায় প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত তাদের দায়িত্ব পালন করবে।