পেঁপে চাষেই ভাগ্যবদল, স্বাবলম্বী খাগড়াছড়ির দুর্গম দূরছড়ির গ্রামবাসী।
শেখ স্বপ্না শিমুঃ শিক্ষা জীবন ব্যর্থ হলেও মাত্র ২২ বছরের যুবক রেম্রাচাই মারমা কৃষিতে সফল হয়েছেন। তার অনুপ্রেরণায় বদলে গেছে খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলার দূরছড়ি গ্রাম। রেম্রাচাই মারমাকে অনুসরণ করে গ্রামের প্রায় সবাই এখন পেঁপে চাষি। তার সঙ্গে দারিদ্রতাকেও বিতাড়িত করে পুরো গ্রামবাসী এখন স্বাবলম্বী। বর্তমানে ওই গ্রামের প্রায় ৫০টি পরিবার অর্থনৈতিকভাবে সুরক্ষিত ও স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে।
খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলার দুর্গম দূরছড়ি গ্রাম; যেখানে পাঁচ বছর আগেও ছিল অভাব-অনটনের চিত্র, সেখানে এখন বদলে গেছে পুরো বাস্তবতা। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছেন তরুণ কৃষক রেম্রাচাই মারমা। তার হাত ধরেই পেঁপে চাষে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে পুরো গ্রাম।
প্রায় ৬০টি পরিবারের এই গ্রামে একসময় জীবিকা নির্ভর ছিল ঝুম চাষের ওপর। কিন্তু ২০২১ সালে স্কুলে পড়ার সময় থেকেই কৃষির প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন রেম্রাচাই মারমা। তখন তার ছিল মাত্র ২০০টি পেঁপে গাছের একটি ছোট বাগান। ২০২৩ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর পড়ালেখা ছেড়ে পুরোপুরি কৃষিতে মনোযোগ দেন তিনি।
পর্যায়ক্রমে এখন তার পেঁপে বাগানের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ একরে, যেখানে রয়েছে প্রায় ৩ হাজার পেঁপে গাছ। চলতি বছরে তিনি প্রায় ২০ লাখ টাকার পেঁপে বিক্রি করেছেন, আর গাছে ঝুলছে আরও প্রায় ৫ লাখ টাকার পেঁপে। ভবিষ্যতে আরও ৩ হাজার গাছের চারা রোপণের পরিকল্পনাও রয়েছে তার।
রেম্রাচাই জানান, একসময় তিনি নিজেই মানিকছড়ি বাজারে পেঁপে বিক্রি করতেন। পরে তার বাগানের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ঢাকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।
তবে শুধু রেম্রাচাই নন, পেঁপে চাষে বদলে গেছে পুরো দূরছড়ি গ্রামের চিত্র। আগে যেখানে অধিকাংশ পরিবার ছিল দরিদ্র, এখন তারা পেঁপে চাষ করে স্বাবলম্বী। প্রতি শুক্রবার গাছ থেকে পেঁপে সংগ্রহ করা হয়, যা ঢাকার ব্যবসায়ীরা প্রতি কেজি ৬০ টাকা দরে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে খুশি স্থানীয় চাষিরা। এই চাষকে কেন্দ্র করে অন্তত ৫০টি পরিবারের কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছে। ঢাকার অনেক সুপারশপেও এখন মানিকছড়ির দূরছড়ি গ্রামের পেঁপে মিলছে।
রেম্রাচাইয়ের দেখাদেখি গ্রামের অন্যরাও এগিয়ে এসেছেন। নারী চাষি রাবাই মারমা ১ একর জমিতে গ্রিন লেডি হাইব্রিড জাতের পেঁপে চাষ করেছেন। এতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। অনুকূল পরিবেশ ও ভালো বাজারদর পেলে তিনিও লক্ষাধিক টাকা আয় করতে পারবেন বলে আশা করছেন।
এছাড়া অংহলাপ্রু মারমাও স্বল্প খরচে পেঁপে চাষ করে লাভবান হওয়ার আশা করছেন। কম জায়গায়, কম খরচে এবং ভালো দামের কারণে দূরছড়ি গ্রামের চাষিদের মধ্যে এখন বাণিজ্যিক পেঁপে চাষের প্রতি আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।
বর্তমানে মানিকছড়ি উপজেলার দূরছড়ি গ্রামের ৫০ পরিবারের ভাগ্য বদলে যাওয়ায় খাগড়াছড়ির আরও অনেক বেকার মানুষ পেঁপে চাষে ঝুঁকছেন, নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে। এর মধ্যে স্বাবলম্বী হয়েছেন খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ভাইবোনছড়া এলাকার জয়রাম চাকমা ও কল্পরঞ্জন চাকমা। দুই বন্ধু মিলে তারা সাড়ে চার একর পতিত জমিতে পেঁপে চাষ করছেন। জমির আগাছা পরিষ্কার থেকে শুরু করে চারা রোপণ পর্যন্ত তারা প্রায় ১৫ লাখ টাকা খরচ করেছেন।
এরই মধ্যে তারা ৬৫ লাখ টাকার পেঁপে বিক্রি করেছেন। এসব পেঁপে স্থানীয়ভাবে বিক্রি করা হয়, পাশাপাশি চট্টগ্রাম, ফেনী ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। চাষিরা দাবি করেন, খাগড়াছড়িতে তাদের বাগানটি সবচেয়ে বড় পেঁপে বাগান। এখানে মূলত রেড লেডী, রাজশাহী পেঁপে, দেশি জাত ও কিছু হাইব্রিড চাষ হয়, তবে অধিকাংশ কৃষক রেড লেডী জাতের পেঁপে বেশি চাষ করেন। পাশাপাশি তাদের বাগান দেখার জন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন আসেন।
মানিকছড়ির দূরছড়ি গ্রামের রেম্রাচাই মারমার পেঁপে বাগান দেখে দেবব্রত চাকমা নামের একজন যুবকও পেঁপে চাষে সফল হয়েছেন। তিনি ৩০ শতক জমিতে পেঁপে চাষ করে প্রতি সপ্তাহে ৫ থেকে ৮ হাজার টাকার পেঁপে বিক্রি করছেন।
খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক নাছির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, রেম্রাচাই মারমার সফলতা দেখেই দূরছড়ি গ্রামে এখন আর কেউ বেকার নেই। অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে যে কেউ রেম্রাচাই মারমার মতো মডেল হতে পারে। পাহাড়ের মাটি ও আবহাওয়া ফল চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় কৃষকেরা ভালো ফলন পাচ্ছেন। কৃষি বিভাগও পাহাড়ের ফল চাষের জন্য কৃষকদের পরামর্শ ও উৎসাহ দিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, যদি বেকার যুবকদের পেঁপে চাষে আগ্রহী করা যায়, তাহলে এটি বেকার সমস্যা সমাধানসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম ফসল হয়ে উঠতে পারে। পেঁপে চাষ বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত উপযোগী; সাধারণত রোপণের ছয় মাসের মধ্যে ফল সংগ্রহ করা যায়। সঠিক যত্ন নিলে দুই বছর পর্যন্ত একটি বাগান থেকে টানা ফল পাওয়া সম্ভব। বসতবাড়ির আশপাশ বা ছাদবাগানে একটি বা দুটি গাছ রোপণ করলেও সারাবছর ফল ও সবজি খাওয়া যায়।
খাগড়াছড়ি কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর প্রায় ৪৩৬ হেক্টর জমিতে পেঁপে চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৬ মেট্রিকটন। খাগড়াছড়িতে প্রায় ৩৫০ জনের মতো কৃষক পেঁপে চাষ করছেন।