১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৬শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি

গোয়াইনঘাট সীমান্তের মাফিয়া ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রকদের পুলিশ-ডিবি-বিজিবির লাইনম্যান

বাংলা বারুদ
প্রকাশিত মে ১২, ২০২৫, ১২:৫৩ পূর্বাহ্ণ
গোয়াইনঘাট সীমান্তের মাফিয়া ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রকদের পুলিশ-ডিবি-বিজিবির লাইনম্যান

Manual1 Ad Code

গোয়াইনঘাট সীমান্তের মাফিয়া ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রকদের পুলিশ-ডিবি-বিজিবির লাইনম্যান

 

ক্রাইম রিপোর্টার : সিলেট সীমান্তের চোরাচালান কোন ভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেনা প্রশাসন। রেঞ্জ ডিআইজি, পুলিশ সুপার, বিজিবির সিও সকলেই যেনো চোরাচালান নিয়ন্ত্রনে বার-বার ব্যার্থতার পরিচয় দিচ্ছেন। যদিও মাঝে মধ্যে দু-একটি চোরাচালানের গাড়ি পুলিশ, বিজিবির হাতে আটক হওয়ার খবর পাওয়া যায়। কিন্তু এগুলো কেবল আইওয়াশ মাত্র।

বড় চালানগুলো নির্বিঘেœ যেতে এই ছোট চালানগুলো আটক করে উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের চোখে ধুলো দেওয়া হয়। সংবাদ মাধ্যম বা টিভি চ্যালেনে চোরাচালানের সংবাদ প্রকাশ করতে করতে স্থানীয় সাংবাদিকরা এক রকম ক্লান্ত। আবার কিছু সাংবাদিক বিক্রি হয়ে গেছেন এসব চোরাকারবারিদের কাছে।

Manual8 Ad Code

তারা দৈনিক-সাপ্তাহিক-মাসিক বখরা নিয়ে থাকেন এসব চোরাকারবারিদের কাছ থেকে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, প্রশাসন চোরাচালান নিয়ন্ত্রনের বদলে এসব চোরাকারবারিদের সহযোগী করছে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসন আমলের শেষ দিকে সিলেট সীমান্তের চোরাচালান ব্যবসাটি মহামারি আকার ধারণ করে। প্রশাসনের কোন কৌশল আর ব্যবস্থা কোন কাজেই আসছেনা। এদিকে প্রশাসনের উপর মহল সীমান্তের চোরাচালান বন্ধ করতে বিভিন্ন নির্দেশনা দিচ্ছেন স্থানীয় প্রশাসনকে, অপরদিকে স্থানীয় প্রশাসনের বড় চেয়ারে বসে থাকা কর্তাব্যক্তিরা সীমান্তের চোরাকারবারিদের সাথে থানায় বসেই টাকার বিনিময়ে চোরাকারবারিদের সব রকম সহযোগীতা করে যাচ্ছেন।

সিলেটের চারটি সীমান্তের থানা গুলো চোরাকারবারীদের কাছে স্বর্গরাজ্য হিসাবে পরিচিত। সেই চারটি থানা হলো, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ। এই চারটি থানার ওসি থেকে শুরু করে স্থানীয় ইউনিয়নের বিট অফিসাগণ সরাসরি ভারতীয় চোরাচালানের সাথে জড়িত বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। সিলেট সীমান্তের চোররাচালান নিয়ে ধারাবাহিক পর্বের প্রথম পর্ব আজ। সিলেটের গোয়ানঘাট থানার প্রায় ৯০ ভাগ এলাকার ভারত সীমান্ত ঘেষা। এ থানায় দায়িত্ব পালন করছেন দরবেশ হিসাবে পরিচিত ওসি সরকার তোফায়েল আহমদ। এই উপজেলা হচ্চে সিলেটের সবচেয়ে বড় চোরাচালানের প্রবেশ পথ। বর্তমান ওসি থানায় যোগদানের পর চোরাকারবারীরা নির্বেঘেœ তাদের চোরাচালান ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। চোরাকারবারিরা ওসির নতুন নাম দিয়েছে দরবেশ হিসাবে।

কারণ টাকা হলে দরবেশের কাছে সাত খুন মাফ। যে যাই করো দিন শেষে দরবেশকে টাকার অংক বুঝিয়ে দিতে হবে। দরবেশ নাকি চোরাকারবারিদের কাছে প্রায়ই বলে থাকেন, তিনি একা এসব টাকা খান না, উপর মহলকে খুশি করতে তাকে এসব টাকা প্রতি সপ্তাহে শহরে নিয়ে যেতে হয়। প্রতি রাতে থানায় বসেই চোরাকারবারিদের কাছ থেকে হিসাবে বুঝে নেন।

ওসির টাকায় কোন দারোগার ভাগ নেই। দারোগাদের নিজেদের রয়েছেন আলাদা টাকার অংক। তবে ওসি নিজেই চোরাচালানের লাইনম্যানদের ইউনিয়ন ভিত্তিক এলাকা ভাগ-বন্টন করে দিয়ে থাকেন। চোরাকারবারিদের ভাষায় চোরাচালানের এই ভাগ করা এলাকাকে সীমান্তের ঘাট বলেন। ওসি নিজেই স্থানীয় বিট অফিসারদের চোরাকারবারিদের সাথে মিট করিয়ে টাকার অংক বুঝিয়ে নিতে বলেন। গোয়াইনঘাট উপজেলার ৩নং পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের সীমান্ত এলাকা হচ্ছে জাফলং জিরো পয়েন্ট, সিড়িঘাট, সাইনবোর্ড, লালমাটি, আমতলা, সোনাটিলা,তামাবিল স্থলবন্দর, আমস্বপ্ন, নলজুরি।

Manual3 Ad Code

এই ইউনিয়নের লাইনম্যান স্থানীয় ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডে মেম্বার গুচ্চগ্রামের বাসিন্দা সাদ্দাম রুহির ছেলে মান্নান আহমদ। তিনি সকলের কাছে পরিচিত মান্নান মেম্বার নামে পরিচিত। উপজেলার চোরাচালান জগতের সব চেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি এই মান্নান। তার সহযোগী হিসাবে রয়েছেন তার ভাতিজা রিয়াজুল ও সিরাজুল। এই ইউনিয়নের নলজুরি এলাকার নিয়ন্ত্রক শান্তিনগরের জয়দুল, নলজুরির সায়েদুর রহমান লিটন (বাবলা)। সোনাটিলার দায়িত্বে রয়েছেন আমস্বপ্ন গ্রামের সাদ্দাম হোসেন, নলজুরির নাঈম আহমদ। এরা সকলে পুলিশ ও বিজিবির লাইনম্যান। এই ইউনিয়নের বিজিবি সংগ্রাম ক্যাম্পের লাইনম্যান হচ্ছে গুচ্ছ গ্রামের মহর উদ্দিনের ছেলে ডালিম। জিরো পয়েন্ট, সিড়িঘাটের বিজিবির লাইনম্যান হচ্ছে হযরত আলী, ইবু। মান্নান মেম্বার হলেন থানা পুলিশ ও জেলা ডিবির ওসির নিয়োগকৃত লাইনম্যান। মান্নান মেম্বারের নেতৃত্বে বিজিবি, ডিবি পুলিশ, ও থানা পুলিশের নামে টাকা উত্তোলন করা হয়।

বিশেষ করে জাফলং এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে, চিনি, চা পাতা, কসমেটিক শাড়ি, থ্রি পিস, রেহেঙ্গা, মোবাইল ফোন, মদ, ইয়াবা, ফেন্সিডিল, হেরোইন সহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পণ্য ও ভারতীয় গরু। জাফলং জিরো পয়েন্টের বিজিবি ও ওসি লাইনম্যান হিসাবে আরো রয়েছেন হয়রত আলী ও ইবু, আজির, শহিদ, নুরু, হুমায়ূনসহ আরো কয়েকজন।

Manual4 Ad Code

১১নং মধ্যে জাফলং ইউনিয়নের লামাপুঞ্জির প্রতাপুর বিজিবির ক্যাম্পের চোরাচালানের লাইনম্যান হচ্ছে পান্নাই সহ স্থানীয় এক ইউপি সদস্য। লুনি গ্রামের কামরুল ইসলাম, খায়রুল ইসলাম, তোফায়েল, ইসলামপুর গ্রামের জসিম উদ্দিন, কাপাউরা গ্রামের কামাল আহমদ, বাউরভাগ গ্রামের হোসেন আহমদ, সোলেমান আহমদ, হালিম, ফখরুল, বুলবুল, জসিম, জিয়া, আরিফুল ইসলাম, ফরিদ, মোশাররফসহ তাদের সিন্ডিকেট এরা সকলেই থানা পুলিশ ও বিজিবির লাইনম্যান।

Manual5 Ad Code

উপজেলার ২নং পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের চোরাচালানের লাইনম্যান যুবলীগ নেতা হাতিরখাল গোচর গ্রামের মশাহিদ আলীর ছেলে কালা মিয়া উরফে শ্যামকালা সদর ইউনিয়নের হওয়াউরা গ্রামে আল আমিন, পান্তুমাই গ্রামের জসিম উদ্দিন। এই তিন জনই হচ্ছে পুলিশ, জেলা ডিবি (উত্তর ওসি) ও সোনারহাট বিজিবি ক্যাম্পের লাইনম্যান। এরা নিয়ন্ত্রণ করে মাতুরতল, সোনারহাট, পান্তুমাই, বাবুরকোনা, হাজিপুর এলাকা।

এসব চোরাচালানের লাইন নিয়ন্ত্রণ করতে তাদের রয়েছেন নিজস্ব লাঠিয়াল বাহিনী। তাদের ভয়ে এলাকার কেউ মুখ খুলতে নারাজ। কেউ মুখ খুললে তাদেরকে ভয় ভীতি দেখান এবং বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে তাদেরকে জেলে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। চোরাকারবারীদের কাছ থেকে প্রতি কিটের কার্টুন থেকে ৫০০টাকা, প্রতিবস্তা চিনি থেকে ৩ শত টাকা, ভারতীয় প্রতিটি গরু থেকে ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা আদায় করেন লাইনম্যানরা।স্থানীয়দের মতে, প্রতিমাসে চোরাচালানের এই লাইনম্যান রদবদল করে সংশ্লিষ্ট থানার ওসি, সার্কেল এএসপি, জেলা উত্তর ডিবির নিয়োগপ্রাপ্ত ওসি ও বিজিবির বিভিন্ন ক্যাম্প কামান্ডাররা। যার ফলে রেঞ্জ ডিআইজি, বা জেলার এসপি কোন নির্দেশ বা আদেশ কার্যকর হয়না সীমান্ত এলাকায়। সীমান্তের এই ঘাটগুলো অলিখিত ভাবে প্রতিমাসে ইজারা দেওয়া হয় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার বিনিময়ে।আগে যেসব চোরাচালানের লাইন নিয়ন্ত্রণক করতো স্থানীয় ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিকলীগের নেতারা। বিগত ৫ আগষ্টের পরে এসব লাইন নিয়ন্ত্রন করছেন যুবদল, শ্রমিকদলের কতিপয় কিছু পাতি নেতারা।