ডেস্ক রিপোর্ট
রংপুর সার্কিট হাউজের মিলনায়তনে সকালটা ছিল অস্বাভাবিক ব্যস্ত। একদিকে সরকারি কর্মকর্তাদের আনাগোনা, অন্যদিকে ক্যাবের সদস্যদের চাপা উৎকণ্ঠা—ঠিক কোন পথে এগোবে দেশের ভোক্তা অধিকার আন্দোলন, সেটার উত্তর যেন অপেক্ষা করছিল বক্তৃতার মঞ্চে দাঁড়ানো মানুষের মুখে।
বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব ও কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান যখন কথা বলা শুরু করলেন, তার কণ্ঠে ছিল অভিজ্ঞতার দৃঢ়তা, আর চোখে ছিল অশ্রুত প্রতিশ্রুতির ঝিলিক।
ভোক্তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে ক্যাবকে নতুন করে ঢেলে সাজানো হচ্ছে,’—বললেন তিনি। বক্তব্যের প্রথম লাইনেই যেন স্পষ্ট হয়ে গেল, এটি শুধু একটি সংস্থার কাঠামোগত বদল নয়; বরং বাজার ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের অনিয়মের বিরুদ্ধে নতুন যুদ্ধের ঘোষণা। তিনি থামলেন না।
সোজাসাপ্টা বললেন—”ক্যাবের কাজ শুধু বাজারের দাম দেখা নয়।’ ওষুধের ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি, নিম্নমানের শিশু খাদ্য, সার আর পরিবহন সিন্ডিকেট, ভেজাল বীজ, খোলা ড্রামে ভোজ্যতেল—এ সবই এখন ক্যাবের দায়িত্বের পরিধিতে আসতে হবে। তার ভাষায়, শুধু ডিসির সঙ্গে মিটিং করে ঢেকুর তুললেই চলবে না। মাঠে নামতে হবে। কাজ করতে হবে। আবু সাঈদের রংপুরকে বদলাতে হবে।
বক্তব্যের এই অংশে মিলনায়তনে একধরনের নীরবতা নেমে আসে। যেন সবাই বুঝতে পারছে, রংপুরের দৈনন্দিন ভোগান্তি—খাদ্যের মূল্য, চিকিৎসার অভাব, কৃষির সংকট—এসব শুধু পরিসংখ্যান নয়; এ এক বাস্তবতার দীর্ঘশ্বাস, যা সফিকুজ্জামানের কথায় হঠাৎ নথিভুক্ত হয়ে গেল। “আমি সরকারে ছিলাম। বাধা ছিল,’—বললেন তিনি। ‘এখন আর কোনো বাধা নেই। এখন ক্যাবের মাধ্যমে মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করতে চাই। তার এই স্বীকারোক্তি সভায় এক অদৃশ্য আলোড়ন তোলে। মনে হচ্ছিল, একজন আমলা তার পুরনো শৃঙ্খল ভেঙে এবার নাগরিক অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানোর পথ খুঁজছেন।
সভায় উপস্থিত জেলা প্রশাসকের উদ্দেশে সফিকুজ্জামান আরও সতর্কবার্তা দেন—”সামনে নির্বাচন। ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করবে। মুনাফার লোভে বাজারকে অস্থিতিশীল করার প্রবণতা বাড়তে পারে। “রংপুরে ভেজাল ওষুধের বাজার নিয়েও তিনি উদ্বেগ জানান—যা প্রশাসন ও ক্যাবের যৌথভাবে মনিটরিংয়ের প্রয়োজনীয়তার দিকে ইঙ্গিত করে।
দিনব্যাপী প্রশিক্ষণে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম, মমতাজ বেগমসহ ক্যাবের বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ কথা বলেন—কিন্তু দিনটির মূল সুর গেঁথে রইল সফিকুজ্জামানের বক্তব্যেই। যেন তিনি শুধু নির্দেশনা দিচ্ছেন না; বরং ভোক্তা অধিকার আন্দোলনের সামনে পরবর্তী পথ খুলে দিচ্ছেন। GAIN-এর সহায়তায় আয়োজিত এই প্রশিক্ষণে খাদ্যের গুণগত মান নিয়ে উপস্থাপনা করেন প্রজেক্ট ম্যানেজার মো. আবুল বাশার চৌধুরী।
রংপুর বিভাগের আট জেলার ক্যাব নেতাদের অংশগ্রহণে সভাটি যেন এক নতুন বার্তা দিল—ভোক্তার অধিকার আর কাগজে নয়, মাঠেই আদায় হবে। রবিবার দিনের প্রশিক্ষণ শেষে মিলনায়তন ফাঁকা হয়ে গেলে যে প্রশ্নটি রয়ে যায়—ক্যাব সত্যিই কি বদলে যাচ্ছে, নাকি এই ঘোষণা আরেকটি প্রতিশ্রুতির মতো মিলিয়ে যাবে? উত্তরটা হয়তো আগামী কয়েক মাসের বাজারের গন্ধেই পাওয়া যাবে।