১লা ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ১০ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৭ হিজরি

গাজীপুরে প্রতি ৪৯ মিনিটে ভাঙছে ১ টি সংসার

বাংলা বারুদ
প্রকাশিত অক্টোবর ২১, ২০২৫, ০৬:৫৮ অপরাহ্ণ
গাজীপুরে প্রতি ৪৯ মিনিটে ভাঙছে ১ টি সংসার

Manual2 Ad Code

নিজস্ব প্রতিনিধি (তমাল চন্দ্র দে)

বেশ কিছুদিন এবং খুবই অল্প সময়ের ভিতরে, কয়েক মাসে সম্পূর্ণ বাংলাদেশে, ডিভোর্সের হার বেড়েই চলেছে। তারই ধারাবাহিকতায়, এক বিশেষ অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন থেকে, বাংলাদেশের শুধুমাত্র গাজীপুর জেলার থেকেই, উঠে এসেছে অকল্পনীয় ডিভোর্সের খবর। গাজীপুরে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা। পারিবারিক অশান্তি, দাম্পত্য কলহ, পরকীয়া, মেয়েদের মায়ের কু-পরামর্শে,যৌতুক এবং অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে প্রতিদিন গড়ে ৩০টি সংসার ভাঙছে এই শিল্পাঞ্চলে। নিকাহ রেজিস্ট্রারের কার্যালয় (কাজি অফিস) ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সালিশি আদালতের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে ১৪ হাজার ৮০টি বিয়েএবং ৭ হাজার ৮৪৩টি বিবাহবিচ্ছেদ রেকর্ড হয়েছে। অর্থাৎ, বিয়ে যত হচ্ছে, তার অর্ধেকেরও বেশি ভেঙে যাচ্ছে-যা সামাজিকভাবে এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে।

নারীরাই দিচ্ছেন বেশি তালাকের আবেদন:- বিবাহবিচ্ছেদের আবেদনের ক্ষেত্রে নারীর সংখ্যাই বেশি। কাজি অফিস সূত্রে জানা যায়, নারীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বামীর ভরণ-পোষণে অক্ষমতা, যৌতুক নির্যাতন, মানসিক অমিল, ও অবিশ্বাসের অভিযোগ তুলেছেন। আবার অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদের আয়ের টাকায় স্বামীর ভাগ বসানো নিয়ে বিরোধ দেখা দিচ্ছে। গাজীপুরের পোশাক শ্রমিক হাফসা খাতুনের (ছদ্মনাম) গল্প অনেকেরই জানা। স্বামীকে ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘদিন অন্য এক পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত হাতেনাতে ধরা পড়লে স্বামী তাকে তালাক দেন। এমন ঘটনা গাজীপুরে এখন নিত্যনৈমিত্তিক, বলছেন সমাজ বিশ্লেষকরা।

Manual8 Ad Code

শিল্পাঞ্চলের ‘চুক্তিভিত্তিক’ বিয়ে:- গাজীপুরের প্রায় ৫ হাজার শিল্পকারখানায় কর্মরত হাজার হাজার শ্রমিকের জীবনযাত্রায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। অনেক সময় দেখা যায়, শ্রমিক দম্পতিরা একসঙ্গে ভাড়া বাসায় থাকতে গিয়ে “চুক্তিভিত্তিক বিয়ে” সম্পন্ন করেন। এসব বিয়ের বেশিরভাগই নিবন্ধিত নয়, ফলে বিচ্ছেদের সময় আইনি জটিলতা তৈরি হয়। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, অনেক নাবালিকা শ্রমিকের বয়স গোপন করে বিয়ে দেওয়া হয়। বিচ্ছেদের পর যখন স্বামী অস্বীকার করেন, তখন সেই বিয়ের কোনো প্রমাণই থাকে না- কাবিননামার নকলও পাওয়া যায় না। এতে নারীরা আইনি আশ্রয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

পরিসংখ্যান বলছে ভয়াবহ বাস্তবতা গাজীপুর জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের তথ্যে দেখা যায়- ১ জানুয়ারি থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত: * বিয়ে: ১৪,০৮০টি * বিবাহবিচ্ছেদ: ৭,৮৪৩টি অর্থাৎ বিবাহের প্রতি ১০০টির বিপরীতে ৫৬টি তালাক। এই হার ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি। তখন বছরে গাজীপুরে ২০,২৮৫টি বিয়ের বিপরীতে ১০,৭১২টি তালাক রেকর্ড হয়েছিল- অর্থাৎ গড়ে প্রতি ৪৯ মিনিটে একটি সংসার ভেঙেছে।

বিবাহবিচ্ছেদের পেছনে প্রধান কারণগুলো:- সামাজিক ও প্রশাসনিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গাজীপুরে বিচ্ছেদের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে- ২. অর্থনৈতিক টানাপোড়েন: দম্পতির আয়-ব্যয়ের পার্থক্য, সঞ্চয় ও খরচের অভ্যাসে অমিল দাম্পত্য কলহের জন্ম দিচ্ছে। ২. পরকীয়া ও অবিশ্বাস: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতা ও কর্মক্ষেত্রের সম্পর্কের জটিলতা পরকীয়ার সুযোগ বাড়িয়েছে। ৩. যৌতুক ও সম্পত্তি বিরোধ: দাওয়াই বা মহর নিয়ে দ্বন্দ্ব, স্বামীর ওপর আর্থিক চাপ, বা যৌতুক দাবিকে কেন্দ্র করে সংঘাত। ৪. মাদকাসক্তি ও চরিত্রগত সমস্যা: অনেক বিচ্ছেদ ঘটছে স্বামীর মাদকাসক্তি ও নেশাজনিত আচরণের কারণে। ৫.সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়: ধর্মীয় ও পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা, দ্রুত সম্পর্ক ছিন্ন করার মনোভাব এবং মধ্যস্থতার অভাবও অন্যতম কারণ।

সমাজ বিশ্লেষকরা যা বলছেন:- গাজীপুরের পিয়ার আলী কলেজের সমাজকল্যাণ বিভাগের প্রফেসর শেখ কামরুন্নাহার বলেন “সম্পর্কের যত্ন ও ভালোবাসার অভাবেই এখন অধিকাংশ দাম্পত্য ভেঙে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এবং আয়-ব্যয়ে অসামঞ্জস্যও বড় কারণ। একসময় যা ছোটখাটো ঝগড়া ছিল, এখন তা সরাসরি তালাক পর্যন্ত গড়াচ্ছে।” তিনি আরও বলেন,- “বিশ্বায়ন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উন্মুক্ততা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব বিবাহবিচ্ছেদের হার বাড়াচ্ছে।” ভাষাশহীদ কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মুকুল কুমার মল্লিক বলেন,- “সহানুভূতির অভাব, সময় না দেওয়া ও জীবনধারার পার্থক্য অনেক দম্পতির সম্পর্ক ভাঙছে। এতে শুধু স্বামী-স্ত্রী নয়, সন্তান ও পুরো পরিবারের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।”

পুলিশ প্রশাসনের মন্তব্য:- গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার ড. মো. যাবের সাদেক বলেন,- “গাজীপুরে স্বামী-স্ত্রী উভয়ই কর্মরত থাকার কারণে নতুন সম্পর্কের সুযোগ বাড়ে। কখনো পরকীয়া, কখনো মাদক – এই দুই কারণেই অধিকাংশ বিচ্ছেদ হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে স্বামীর মাদকাসক্তি স্ত্রীকে নির্যাতনের দিকে ঠেলে দেয়। এসব ঘটনার পরিণতি প্রায়ই তালাক বা আত্মহত্যায় গিয়ে ঠেকে।” সমাজের উপর প্রভাব:- বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচ্ছেদের এই হার কেবল একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজকেই বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে। সন্তানদের মানসিক সমস্যা ও পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটছে, নারীরা অর্থনৈতিকভাবে অসহায় হয়ে পড়ছেন, সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

করণীয় ও সুপারিশ:- সামাজিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিবাহের আগে ও পরে পরামর্শ ও কাউন্সেলিং বাধ্যতামূলক করা উচিত, কাজি অফিসে নিবন্ধন ও যাচাই কঠোর করা প্রয়োজন, অবৈধ বিয়ে রোধে প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়াতে হবে, স্কুল-কলেজ পর্যায়ে দাম্পত্য শিক্ষা ও সহানুভূতি শেখানোর পাঠক্রম অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, এবং পরিবার ও সমাজে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটাতে হবে।

Manual4 Ad Code

উপসংহার: গাজীপুরে প্রতিদিন ৩০টি সংসার ভাঙা শুধু একটি সংখ্যা নয়— এটি এক সামাজিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত।অর্থনৈতিক বাস্তবতা, মূল্যবোধের অবক্ষয় ও সম্পর্কের প্রতি উদাসীনতা যদি নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তবে গাজীপুরের এই চিত্র আগামী বছরগুলোতে আরও ভয়াবহ হতে পারে।

তাহলে একটু ভেবে দেখেছেন কি? শুধুমাত্র গাজীপুরে যদি এই অবস্থা হয়! সারা বাংলাদেশের কি অবস্থা!

এই অনুসন্ধান সারা বাংলাদেশে চলমান থাকবে, খুব শীঘ্রই আরো সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ নিয়ে দ্বিতীয় পর্ব আসছে।

আরো অকল্পনীয়, চাঞ্চল্যকর সত্যের তথ্য নিয়ে, ডিভোর্সের এই অনুসন্ধান মূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে, সম্পূর্ণ বাংলাদেশের বিভাগ, থানা, জেলা, উপজেলা এবং শহর থেকে গ্রাম বাংলার, সকল ডিভোর্সের চলমান প্রতিবেদন মূলক, অনুসন্ধানি লোহমর্ষক এবং হৃদয় বিদায়ক, যা কিনা আপনাকে ভাবতে এবং আপনার হৃদয় ছুঁয়ে হয়তো, অশ্রু ও ঝরতে পারে,এমন সব শিহরিত খবর পেতে সাথেই থাকুন।

সকলে ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন, নিজের পরিবারের প্রতি খেয়াল রাখবেন, আর আশেপাশে অবশ্যই, নিজ দায়িত্বে খবর নিবেন বা খবর রাখবেন, যেন কারো সংসার না ভাঙ্গে, কারন ভেঙ্গে ফেলা খুব সহজ, আর গড়ে তোলা অনেক কষ্টের।

Manual1 Ad Code

দ্বিতীয় পর্বের জন্য অপেক্ষায় থাকবেন, খুব শীঘ্রই দ্বিতীয় পর্ব আসছে।

Manual3 Ad Code